Jogisiswar Rishi Yagya Vulkya/12000 প্রাচীন ভারতের ইতিহাস

 ভারতবর্ষ তার জ্ঞান প্রদীপ জ্বালিয়ে আত্মার অবিনাশী তত্ত্বের পসরা

Ancient India with her arts and culture
Dance Universe

সাজিয়ে মানবতাকে শ্রেষ্ঠ আসনে বসিয়ে মানব জীবনের জয়গান গেয়েছে।রাশি রাশি আনন্দ এবং আনন্দই ভারত এবং ভারত কথা।সংবাদ এবং সংবাদই যেন ভারতের আনন্দ মেলা।
Son of Bharat Mata
Bharat Mata 


 

যোগেশ্বর ও যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণকে জানি কিন্ত যোগিশ্বর  ও যোগিশ্বর  যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে কতটুকু জানি।যোগিশ্বর বলে সম্বোধন  করেন মহাদেব  ।    ঋষি চিন্তা বিজ্ঞানকে করেছে শ্রেয়।অধর্মকে  করেছে ত্যাগ। প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিয়ে জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়েছেন ঋষিরা ।

যাজ্ঞ্যবল্ক্য ও যাজ্ঞ্যবল্ক্য একটি নাম নয় ঋষি শ্রেষ্ঠ ও জ্ঞানের সাগর।

কে এই যাজ্ঞ্যবল্ক্য ? 

কাউকে যদি  বলা হয় কয়েকজন প্রাচীন ঋষির নাম করুন। যাজ্ঞ্যবল্কের নাম করতেই হবে তাকে।অন্য ঋষিদের মাঝে তিনি এক নক্ষত্র।অন্য  ঋষিরা হলেন কপিল, ভৃগু , বশিষ্ঠ ও গৌতম , পুলস্হ । 

তিনি ঈশ্বরকে  জেনে আনন্দময় জীবনে নিজেকে আবদ্ধ রাখেন নি।ইতিহাস পাঠ করলে জানা যায় যাজ্ঞ্যবল্ক্য শুধু শুক্লযর্জুবেদই দান করেন নি।তিনি  উপনিষৎ রচনা করেছেন।ঈশোপনিষৎ ও বৃহদারণ্যক উপনিষৎ।আমরা জানি যে, বেদ অপৌরেষেয় অর্থাৎ বেদ  স্বয়ং শ্রী ভগবানের মুখ-নি:সৃত বাণী। ঋষিরা হলেন বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা।

Sound of creation
Sound of universe 

  

স্বামী বিবেকানন্দের লেখা হতে জানা যায় যে ,"শাস্ত্র শব্দে আদি অনন্ত বেদ বুঝায়"।বেদ ধর্ম কে শাসন করতে সক্ষম। পুরাণাদি স্মৃতি শাস্ত্র শব্দ বাচ্য; এবং তাদের  প্রামাণ্য   যে  পর্যন্ত তারা শ্রুতিকে অনুসরণ করে, সেই পর্যন্ত। সত্য  দুই  প্রকার:

 (1)মানব সাধারণ -পন্চেন্দ্রীয়-গ্রাহ্য ও তদুপাস্হাপিত অনুমান দ্বারা গৃহীত। 

(2) যা অতীন্দ্রিয় সুক্ষ যোগজ শক্তির  গ্রাহ্য।

প্রথমে বিজ্ঞান আহরিত জ্ঞানের কথা বলা হলো।যা আমারা যুক্তি,প্রমাণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে অর্জন করতে পারি। পর অতীন্দ্রিয় জ্ঞান যা অলৌকিক যা দিব্য দর্শন নামে অবহিত তাই বেদ। আমাদের ঋষিরা  বলেছেন বেদের মাধ্যমে আমরা যা বলছি তা পরীক্ষা করো।অতীন্দ্রিয় জ্ঞান যার মাধ্যমে প্রকাশিত হয় তিনি হচ্ছেন ঋষি।আর যিনি অতীন্দ্রিয় শক্তির বা পৌরষেয়র যে রূপ নিজের মধ্যে ও চরাচরে দেখতে  পান  তা হচ্ছে বেদ।বেদ উপলব্ধি সন্ঞ্জাত জ্ঞান। 

ঋষিরা বেদ রচনা করেননি।ভারতের ইতিহাসের ছাত্ররা জানেন যাজ্ঞ্যবল্ক্য  শুক্লযর্জুবেদ বেদ আমাদের দান করেছেন।

 তবে ঋষি হিসেবে তার স্থান কোথায়?

বহু উপরে।বেদ  তখন ও ভাগ হয়নি।ছাপানো  পদ্ধতি জানা ছিল না সেই যুগে।এতোবড়ো বেদকে শ্রুতির মাধ্যমে মনে রাখতে হতো।ধীরে ধীরে তা ভার হয়ে যাচ্ছিল ঋষিদের কাছে।বেদব্যাস বেদের ভাগ করার দায়িত্ব নিলেন। সৃষ্টি হলো ঋক বেদ,যর্জুবেদ, সামবেদ অথর্ব বেদ।ভাগ করে দিলেন তার শিষ্যদের মধ্যেই। পৈল পেলেন ঋকবেদ,বৈশাম্পন পেলেন যর্জুবেদ,জৈমিনি পেলেন সামবেদ আর সুমন্ত পেলেন অথর্ববেদ।ঋষি দ্বৈপায়ণ হলেন বেদব্যাস।

এই বৈশাম্পনের শিষ্য যাজ্ঞ্যবল্ক্য। একদিনে আশ্রমে ফিরে এসে যাজ্ঞ্যবল্ক্য দেখেন বৈশাম্পন  খুব দু:খী মনে বসে আছেন। গুরুর মন দুঃখী দেখে তার মন চঞ্চল  হয়ে উঠলো।তিনি জিজ্ঞেস করতেই গুরুদেব বললেন আমি ব্রহ্ম হত্যার পাপে দোষী। এক ঋষি স্থানীয় ব্যক্তি তাকে  আশ্রমে যেতে বলেছিলেন এবং তিনি নিমন্ত্রণ গ্রহন করেন তা তিনি অনুসরন করেননি। তখন যাজ্ঞ্যবল্ক্য  বললেন আমি এর সমাধান জানি।আমি আপনাকে এই পাপ থেকে মুক্ত করবো।

বৈশাম্পন জানতেন যাজ্ঞ্যবল্ক্যের এই  ক্ষমতার কথা । যাজ্ঞ্যবল্ক্যের সাথে তার বিরোধ হলো পদ্ধতি নিয়ে।বিরোধ চরম জায়গায় পৌছাল।বৈশাম্পন যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে আশ্রম  ছেড়ে যেতে বললেন। তিনি যে জ্ঞান দিয়েছেন তা ফিরিয়ে দিতে বললেন।

যাজ্ঞ্যবল্ক্য বমনের মাধ্যমে তা ফিরিয়ে দেন।তখন বৈশাম্পনের এক শিষ্য তিত্তীরিয় পাখী সেজে তা খেয়ে ফেলে।ঐ থেকেই মহান উপনিষদের জন্ম হয়।তা থেকে হয়  তৈত্তৈরিয় উপনিষৎ।

যাজ্ঞ্যবল্ক্যের পারিবারিক ইতিহাস জেনে নেই।ব্রহ্মরাত নামে এক ঋষির  ঘরে যাজ্ঞ্যবল্ক্যের জন্ম। তার  পিতা ছিলেন বৈদিক ঋষি ।তার কোন সন্তান ছিল না।ব্রহ্মরাত জ্ঞান তপস্বী ও মানুষের সুখ দুঃখ নিবারণ মাধ্যমে ঈশ্বর প্রচার করতেন। 

স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণের মাধ্যমে তিনি কামধেনু যজ্ঞ করার সিদ্ধান্ত নেন।সেই অনুযায়ী এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।এই পুত্র সন্তান ই তেজস্বী যাজ্ঞ্যবল্ক্য। ক্ষুরধার মেধা ও জ্ঞান নিয়ে তিনি জ্ঞানের খোঁজে ব্যাপৃত রইলেন।

উপনয়ন হলো।সঠিক সময়ে বৈশাম্পনের আশ্রমে শিক্ষা লাভ করেন। সেখানে তিনি কৃষ্ণযর্জুবেদ প্রদান করেন।

যাজ্ঞ্যবল্ক্যের আর্বিভাবে ভারতের ঋষিকুলকে অনুপ্রাণিত করেছে। ব্রহ্মরাত ও তার পত্নী সুনন্দা তাদের পুত্র নিয়ে সুখে ছিলেন। বৈশাম্পন ছিলেন  সুনন্দার ভাই।বৈশাম্পনের সঙ্গে মতবিরোধ হলো।বৈশাম্পনের নির্দেশে আশ্রম ছাড়লেন।গুরুর আদেশ শিরোধার্য্য।

তারপর তিনি সূর্যের উপাসনা করলেন। সূর্যের  উপাসক হিসেবে শুক্লযর্জুবেদ দান করলেন এবং শাকল্যের আশ্রমে জ্ঞান লাভে যুক্ত হলেন। শাকল্যের আশ্রমের ব্যায়ভার বহন করতেন স্থানীয় রাজা সুপ্রিয়।কিন্ত রাজনুগ্রহ যাজ্ঞ্যবল্ক্যের পছন্দ ছিল না।অন্যদিকে প্রতিদিন রাজাকে চরণামৃত দিয়ে আসতে হতো।একদিন শাকল্যের শিষ্য যিনি রাজাকে চরণামৃত দিতে যেতেন তিনি অনুপস্থিত, তাই গুরুর নির্দেশে যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে যেতে হলো ।তার এই কাজ পছন্দ ছিল না।কিন্ত গুরুর নির্দেশ  শিরোধার্য।

তিনি রাজাকে গিয়ে দেখলেন রাজা এক রমণীর কন্ঠালগ্না হয়ে আছেন। কামাতুর কন্ঠে বললেন ,"চরণামৃতের চেয়ে অধরামৃত অনেক শ্রেষ্ঠ। তুমি চরণামৃত কোথাও রেখে যাও"।বিরক্ত  হয়ে যাজ্ঞ্যবল্ক্য বললেন," চরণামৃত কোথায় রাখবো? তোমার ভাগ্যে এই চরণামৃত নেই।"

রাজা বললেন,"ফেলে দাও না হয় স্তম্ভের  উপর ছুড়ে মারো"।যাজ্ঞ্যবল্ক্য চরণামৃত ছুড়ে মারতেই এক অভাবনিয় ঘটনা ঘটলো।স্তম্ভের উপর এক স্বর্গীয় গাছের জন্ম হলো।রাজা ভীত হলেন। যাজ্ঞ্যবল্ক্য ফিরে এলেন আশ্রমে।শাকল্যের নিকট কিছু বললেন না।রাজা ভীত  হয়ে আশ্রমে দেখা করলেন। রাজা বুঝতে পারলেন  যাজ্ঞ্যবল্ক্য কাউকে কিছু বলেনি  । পরদিন শাকল্য তাকে ডেকে বললেন ,"রাজনুরোধে তোমাকেই চরণামৃত নিয়ে যেতে হবে"।

যাজ্ঞ্যবল্ক্য গুরু আজ্ঞা পালন করতে রাজি হলেন না।বললেন আমি আশ্রম ছেড়ে চলে যাচ্ছি, এতে দুদিক রক্ষা পাবে।গুরুদেব আমাকে আশ্রম ত্যাগ করার আদেশ দিন।শাকল্য তাই করলেন।

তিনি শাকল্যের আশ্রম ত্যাগ করে যাজ্ঞ্যবল্ক্যের আশ্রমে গেলেন। রাজর্ষি হিরণ্যানাথের আশ্রমে গেলেন।  এই ঋষি  ইক্ষাকু বংশীয় ক্ষত্রিয়  ছিলেন। এই আশ্রমে যাজ্ঞ্যবল্ক্য  যোগ শাস্ত্র অধ্যায়ণ করলেন। জ্ঞান পিপাসু যাজ্ঞ্যবল্ক্য আবার ঋষি উদ্দালকের শিষ্য হলেন আর সব কিছু শ্রুতিতে ধরে রাখলেন । এ ছিল মেধা শক্তির চরম প্রকাশ। 

যাজ্ঞ্যবল্ক্য আবার ফিরে এলেন বৈশাম্পনের আশ্রমে।মুগ্ধ হলেন বৈশাম্পন তার জ্ঞান তৃষ্ণা দেখে।

যাজ্ঞ্যবল্ক্য একদিন শ্বেতকেতু ও সোমশুষ্মকে নিয়ে অগ্নিহোত্রী যজ্ঞ  আলাপ আলোচনা করেছিলেন। এই পথ দিয়েই রাজা জনক যাচ্ছিলেন। তিনি নবীন যুবকদের মধ্যে আলাপ আলোচনার বিষয় বস্তু জানতে পারলেন। রাজর্ষি  জনক গম্ভীর আলোচনা দেখে রথ থেকে নেমে আলাপ আলোচনায় অংশ গ্রহন করলেন। কিছুক্ষণ পর জনক উঠে যাবেন,এমন সময় যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে বললেন অপর দুই যুবকের এখনও সম্পুর্নতা আসেনি।বলে রথে গিয়ে বসলেন।অপর দুই যুবকের মনে এই কথা কোন রেখাপাত করলো না। কিন্ত যাজ্ঞ্যবল্ক্যের মনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি  করলো।তিনি জনকের রথ আটকালেন, তার এই কথার ব্যাখা চাইলেন।তখন রাজর্ষি জনক ঐ যুবকের কাছে কিছু প্রশ্ন করলেন এবং ব্যাখা চাইলেন।  জনক বুঝতে পারলেন যাজ্ঞ্যবল্ক্য যুগ সূচনা কারি পুরুষ।তার কাছে কিছু প্রশ্নের ব্যাখা চাইলেন রাজা জনক অবশ্যই মহা তেজস্বীর অনুমতি নিয়ে তা করেছিলেন। 

রাজা জনক পিতার নির্দেশে যজ্ঞ করবেন। আমন্ত্রিত যুগ পুরুষ ও ব্রহ্মর্ষি বৈশাম্পন,ব্রহ্মর্ষি পৈল,ব্রম্মর্ষি জৈমিনি ও ব্রহ্মর্ষি সুমন্ত। ব্যাসদেবের শিষ্য। যাজ্ঞ্যবল্ক্য সহ অন্যান্যরা ও নিমন্ত্রিত।যজ্ঞের  বিভিন্ন দায়িত্ব নেবেন ঐ চার ঋষি।যজ্ঞের পুরোহিত হবেন বৈশাম্পন। যজ্ঞ হলো তৎক্ষণাৎ যজ্ঞের ফল মিললো না।আরেক বার হলো  তাতেও ফল মিললো না।

যাজ্ঞ্যবল্ক্য যজ্ঞের ভার নিলেন।সম্পন্ন করলেন ,তৎক্ষণাৎ ফল  লাভ হলো।সবাই ধন্য ধন্য করলেন যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে। দক্ষিণা কে পাবেন?  বৈশাম্পন না ভাগ্নে যাজ্ঞ্যবল্ক্য। এতো সাধারণ দক্ষিণা নয়।রাজা জনকের দক্ষিণা এ তো বিশাল ব্যাপার আবার  যোগ্যতার স্বীকৃতি।জ্ঞানের জীবন্ত লাইব্রেরী বারো হাজার বছর পরেও মানুষ তাকে ভোলেনি।রবীন্দ্রনাথের পাতায়  পাতায় তার খোঁজ পাওয়া যায়।রবীন্দ্রনাথ ও দেবেন্দ্র নাথ উভয়েই যেন  সম্মোহিত।সম্মোহিত ভারতবর্ষ। 

যাজ্ঞ্যবল্ক্য গার্হস্হ্য জীবনে প্রবেশ করলেন। কাত্যায়নীকে বিয়ে করলেন যাজ্ঞ্যবল্ক্য ।কাত্যায়নীর প্রেম নিষ্ঠায় তিনি আরও তেজস্বী হলেন।

রাজা জনক এক ঋষি সভা ডাকলেন। নিজে রাজর্ষি ও ব্রহ্মর্ষি দুই।  শ্রেষ্ঠ জ্ঞানিরা উপস্থিত হলেন।ব্রহ্মর্ষি গণ এলেন একে একে।গার্গী,মৈত্রেয়ী এলেন।ঋষি উদ্দালক।ঋষি অশ্বল। এলেন আরুণি ।সবাই ঋষি শ্রেষ্ঠ।রাজা জনক ঘোষণা করলেন যিনি প্রশ্নের উত্তর পারবেন তিনিই সহস্র গরুর মালিক হবেন ।সবাই চুপ করে  আছেন।  যাজ্ঞ্যবল্ক্য শিষ্যদের আদেশ দিলেন গাভী গুলো আশ্রমে নিয়ে যাওয়ার জন্য।তখন হৈ চৈ শুরু হলো । গার্গীকে নিরস্ত্র   করতে হলো। বচ ক্লীব  গার্গীর     প্রশ্ন। একের পর এক উত্তর দিয়ে গেলেন যাজ্ঞ্যবল্ক্য। তার তেজস্বী রূপ দেখে মৈত্রেয়ী মোহিত হলেন। মৈত্রেয়ীর মনে প্রেমের সঞ্চার হলো।আরুণি, উদ্দালক, অশ্বল ও অন্যান্যরা


মৈত্রেয়ী কবি আবার ঋষি।মৈত্রেয়ী আর যাজ্ঞ্যবল্ক্য  বারো হাজার বছর ধরে ভারতবর্ষ কে বিমোহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ তার একটি কবিতা অনুবাদ করতে গিয়ে বলেছিলেন চৌদ্দটি শব্দের এই কবিতার ভাব ও  শব্দের বুনট অনুবাদ করা আমার  সাধ্যের অতীত।রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ীর  ব্রাহ্মণ কবিতাটি তিনটি পৃষ্ঠায় শব্দজালে আবদ্ধ করেছেন। আর মৈত্রেয়ী মাত্র চৌদ্দ শব্দে।গার্গী ছিলেন মৈত্রেয়ীর মাসী।মৈত্রেয়ী শিশু বয়সে তাঁর  মাকে হারান।গার্গী এক ঋষির আশ্রমে বিদ্যালাভ করছিলেন। তাকে ব্রম্মবাদিনী  গার্গী বলা হতো।   গার্গী  মৈত্রেয়ীকে বড় করার জন্য মিত্রের বাড়ীতে  বসবাস করতে লাগলেন।মৈত্রেয়ী,  গার্গীর সাথে জ্ঞান লাভের চেষ্টায় মেতে উঠলেন।আর আশ্রম গুলোতে ঘুরে ঘুরে বিদ্যা অর্জন করতে লাগলেন। 

যাজ্ঞ্যবল্ক্যের সাথে পরিচয় ঘটে মিত্রের। 

মিত্র ছিলেন জনকের আমাত্য।একদিন  চোখ বুঝে ধ্যান মগ্ন হয়েছিলেন যাজ্ঞ্যবল্ক্য। এক বাঘ তাকে দেখতে পেয়ে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়।আমত্য মিত্র তা দেখতে পেয়ে বাঘকে হত্যা করেন।এই ভাবে তাদের পরিচয় গভীর হয়।

যাজ্ঞ্যবল্ক্যের প্রেমে পড়েছেন মৈত্রেয়ী। মৈত্রেয়ীর পিতা মিত্র তাকে অনেক বুঝালেন কিন্ত তিনি বললেন," যাজ্ঞ্যবল্ক্য   এতে রাজী হবেন না।" কাত্যায়নী সেদিন আশ্রমে   ছাগল ও মৃগ শিশুর  সাথে খেলা করছিলেন।  মৈত্রেয়ী তার সন্নিকটে গেলেন এবং দুজনে বন্ধু হয়ে গেলেন  । সখ্যতা গভীরে পৌছলো। কাত্যায়নী জানতে পারলেন মৈত্রেয়ীর প্রেমের কথা।যাজ্ঞ্যবল্ক্যেকে মন দিয়ে বসে আছেন মৈত্রেয়ী। কাত্যায়নী মনে মনে ভাবলেন  সুযোগ দেখে যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে  মৈত্রেয়ীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেবেন । 

মহর্ষির   ভ্রুক্ষেপ নেই । মৈত্রেয়ী  তপস্যা শুরু করলেন আশ্রমের কাছাকাছি বট গাছের নীচে। একদিন যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে জিজ্ঞেস করলেন,"মৈত্রেয়ী তো বিদূষী বলে মনে হয়।"

যাজ্ঞ্যবল্ক্য বললেন,"বিদূষী বটে। আশ্রমে প্রায়ই আসে"।

"তার বিয়ে হলে তাকে আমি দেখতে পাবো না। তার বয়স হয়েছে। সে আমার প্রাণপ্রিয়  সখি", কাত্যায়নী বললেন। 

"বিয়ে তো হবেই। বিয়ের পর স্বামীর বাড়ী থাকবে।সে আশ্রমে আসবে তুমি তার বাড়ীতে যাবে।" যাজ্ঞ্যবল্ক্য বললেন। 

মৈত্রেয়ী বললেন ,"এর চেয়ে ভালো তুমি তাকে বিয়ে করো।"

যাজ্ঞ্যবল্ক্য বললেন ,"এ কথা মুখে এনো না।তোমার ক্ষতি তুমি করতে চাইছো!"

অশেষ পীড়াপীড়িতে  যাজ্ঞ্যবল্ক্য রাজী হলেন। সারা জীবন কাত্যায়নীর অনুগত থেকেছেন মৈত্রেয়ী। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় কবি মৈত্রেয়ী।শব্দ ও ভাবের বুনটে তার কবিতা আমাদের প্রিয়।

শেষের কথা আগে বলে নিই।যাজ্ঞ্যবল্ক্য বাণপ্রস্হে যাবেন। সমস্ত সম্পত্তি তাদের মাঝে বেটে দেবার জন্য ডাকলেন। কাত্যায়নী ও মৈত্রেয়ীকে আহ্বান জানালেন। তারা আসতেই বললেন,"আমি বাণপ্রস্হে যাবো , এই নাও সম্পত্তি।"

মৈত্রেয়ী এই কথা বললেন সারা পৃথিবী   শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়লো। আজ থেকে 12/13 হাজার বছর আগে এক বিদূষী নারী বলে গেলেন এক সঙ্গীত  তরঙ্গে। পৃথিবী স্তম্ভিত হয়ে শুনলো, রাশি রাশি সম্পদ হাতে নিয়ে এক নারী বলছেন," এ দিয়ে আমি কি করবো ? এতে কি আমি অমৃতের সন্দ্ধান পাবো।"

যাজ্ঞ্যবল্ক্য বললেন," না, প্রিয়ে। তোমাকে অমৃতের সন্দ্ধান  করতে হবে"।

যাজ্ঞ্যবল্ক্য তখন তাকে অমৃতের সন্দ্ধান দিলেন। এই মহিয়সী নারী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন,

"হে তপস্বিনী মৈত্রেয়ী,এসো,সংসারের উপকরণ পীড়িতের হৃদয়ের মধ্যে চরণ দুটো স্থাপন করো।তোমার সেই অমৃতের প্রার্থনাটি তোমার মৃত্যুহীন মধুর কন্ঠে আবার হৃদয়ে স্হান করে যাও"।

যাজ্ঞ্যবল্ক্য  মহাভারত পূর্ব সময়ের। রামায়ণের  সমকালিন।মহাভারতে যাজ্ঞ্যবল্ক্যের উল্লেখ আছে।ক্যাতয়ণীর ছিল মেনেজম্যান্ট জ্ঞান। তার তিন পুত্র। কেউ বলেন চারজন।আশ্রমের হাজার হাজার ছাত্রের সুবিধা অসুবিধা দেখতেন কাত্যায়নী।অর্থ থেকে বাকী সব দেখতেন কাত্যায়নী।কাত্যায়নী যাজ্ঞ্যবল্ক্যের কোন অসুবিধাই রাখতেন না।কাত্যায়নী নিজের প্রিয় মুহুর্ত গুলো মৈত্রেয়ীর সঙ্গে ভাগ করেছিলেন। মৈত্রেয়ী  কাত্যায়নীর উদারতায় মুগ্ধ  হয়ে বললেন ," আমি বিদুষী ও শিক্ষিত হলেও তোমার দাসী রূপে মনে করি কারণ তুমি লোকত্তোর পুরুষের সহধর্মিনী।"

কাত্যায়নীর চরিত্র কে কোন মহিমায় প্রকাশ করবেন। ভাষা যেন ছোট হয়ে যায়।শব্দ যেন কম হয়ে যায়।কাত্যায়নীকে" বিদেহ লক্ষী" বা "বিদেহ -শ্রী" বলা হয় ।একবার অনার্য রাজ মল্লিক ও কাশিরাজ যুগপৎ ভাবে বিদেহ আক্রমণ করে।কাত্যায়নী অতি কুশলতায় মল্ল রাজ কন্যার সাথে বিদেহী রাজের বিয়ে দিয়েছিলেন। মহাভারতে কাত্যায়নীকে শ্রীকৃষ্ণের  ছোট বোন বলা হয়।কিন্ত সময়ের সাথে মেলে না।যাজ্ঞ্যবল্ক্য রাজা জনকের  সময়কার । মহাভারত অনেক পরে।

এবার আসা যাক অন্য ঘটনায়।যাজ্ঞ্যবল্ক্যের আশ্রমে তার এক বিধবা ভগীনি থাকতো।কালক্রমে সে সন্তান সম্ভবা হয়ে পরে।বিষয়টি গোপন রেখে সে তীর্থ  ভ্রমণে বেরিয়ে পরে।বনে ঘুরতে ঘুরতে সে সন্তানের জন্ম  দেয়।শিশু সন্তান টি বট গাছের নীচে  ফেলে রেখে আশ্রমে চলে আসে।শিশুটি বড় হতে থাকে।নারদের সাথে দেখা।নারদ  তাকে দেখে বললেন তোমার  পরিচয় কি? বাবা মাই বা কে?

সে বললো ,"আমায় সবাই ডাকে পিপ্পলাদ।আমি কে আমি জানি না।"

নারদ ধ্যানের মাধ্যমে সব জানতে পারলেন। বললেন,"যাজ্ঞ্যবল্ক্যের ভাগিনেয়।কংসারির  ছেলে তুমি।"

এই কথা শুনে পিপ্পলাদ রেগে অগ্নিশর্মা।যাজ্ঞ্যবল্ক্যের ভাগ্নে হয়ে আমি কিনা পালন পোষন পাইনি।যাজ্ঞ্যবল্ক্যের ধ্বংস চাই।শুরু হলো তান্ত্রিকতার সাধনা। পিপ্পলাদ তপোপ্রভাবে কৃত্যা নামে এক শক্তির সৃষ্টি করলো।এবং যাজ্ঞ্যবল্ক্যের ধ্বংস কামনা করলো সে।কৃত্যা যাজ্ঞ্যবল্ক্য কে আক্রমণ করলো।যাজ্ঞ্যবল্ক্য আঘাত পেলেন। তিনি ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন। কিন্ত তারা বললেন যে পিপ্পলাদ হচ্ছে যোগ ভ্রষ্ট জীব তাকে ধ্বংস করার বিদ্যা তাদের আয়ত্তে নেই।  মহাদেবের শরীরে যোগিশ্বর যাজ্ঞ্যবল্ক্য   সুক্ষ  শরীরে  প্রবেশ করলেন। পিপ্পলাদ মহাদেব কে দেখে ভয়ে পালিয়ে যায়।তার জীবনে ঘটনার শেষ নেই। 

মহান ঋষিদের একজন গার্গী।বচ ক্লীব গার্গী যাজ্ঞ্যবল্ক্যের আশ্রমে এলেন। তার শিষ্যত্ব চাইলেন। কিন্ত  যাজ্ঞ্যবল্ক্য তাকে ফিরিয়ে দিলেন।গার্গী  বিচলিত হলেন।পরবর্তীতে তিনি যাজ্ঞ্যবল্ক্যের শিষ্য হলেন। শিষ্যা মানে ভার্যা।

যাজ্ঞ্যবল্ক্যের রচনাবলি:

শুক্লযর্জুবেদ,কৃষ্ণ যর্জুবেদ,ঈশোপনিষদ,বৃহদারাণ্যক ও তিত্তিরিয় উপনিষদ।শতপথ ব্রাহ্মণ। 

"ঈশোবাস্ম্যমিদং সর্বং যৎ কিন্চ জগত্যাং জগৎ।

তেন ত্যাক্তেন ভূঞ্জীথা মা গৃধ: কস্যসিদ্ধনম।"

এই শ্লোকটি ব্যবহারিক জীবন ও আধ্যাত্মিক জীবনের রূপ রেখা বর্ণনা  করেছে।সমস্ত পৃথিবী ঈশ্বর  দ্বারা আচ্ছাদিত।এবং তোমার জন্য সব কিছু নয়।ত্যাগ করে ভোগ করো।রবীন্দ্রনাথ বলুন,অরবিন্দ বলুন বা দেবেন্দ্র নাথ ঠাকুর বলেন সবই এই শ্লোক দ্বারা প্রেরণা পেয়েছেন। বেদের ঋষিরা বলেছেন ঈশ্বর সিংহাসনে বসে থাকা ব্যক্তি নন।আবার তিনি আদেশ নির্দেশ দেন না।তিনি পাপ পুণ্য দেখেন না ,দেখেন Right or wrong । তিনি প্রকাশিত হন তারই সৃষ্টির মাধ্যমে।আমূর্ত্ত থেকে তিনি মূর্ত। 

তার তপস্যায়  মহাদেব স্বয়ং সন্তুষ্ট  হয়ে ,তার নাম দেন যোগিশ্বর। তার পরিচয় নিম্ন শ্লোকে:

যোগিশ্বর যাজ্ঞ্যবল্ক্যং , নারায়ণং নমস্কৃত্য,

অথাতো ধর্মব্যখ্যানম, অথাতো ধর্মজিজ্ঞাসা,

অর্থাতো ব্রহ্ম জিজ্ঞাসা,ওঁম নমো  ব্রহ্মণে' ইত্যাদি,।তার মতো ঐশ্বর্য শালি ঋষি ও কম ছিল। 

মৈত্রেয়ীর গর্ভে কোন সন্তান হয়নি।

কাত্যায়নীর গর্ভে তিন সন্তানের জন্ম হয়।কাত্যায়ণ নামে এক পুত্র ছিল। 

তখন ব্রাহ্মণ রা ক্ষত্রিয়ের দেওয়া জল খেতেন না।যাজ্ঞ্যবল্ক্য ঘোষণা করলেন ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণ অপেক্ষা কোন অংশে নিম্ন স্তরের নয়।

রাজা জনমজেয় যজ্ঞ করবেন। যাজ্ঞ্যবল্ক্যকে যজ্ঞের পুরোহিত হিসেবে ঘোষনা করেন।বৈশাম্পন এর বিরোধিতা করেন। শুধু তা নয় রাজাকে সনাতন বিরোধী আখ্যা দেন।রাজাকে অনেক অসুবিধার মধ্যেই  নিজের কথা রাখতে হয়।এ ছিল নতুনের সাথে পুরাতনের লড়াই।

 যোগিশ্বর যাজ্ঞ্যবল্ক্য নতুন ভাব ধারার জন্ম দিলেন।তিনি মিথিলা ও হস্তিণাপুরের রাজাদ্বয়ের সমর্থন পেলেন। মিথিলার নগরীর কাছে এক বড় আশ্রম প্রতিষ্ঠা করলেন। উক্ত আশ্রম হয়ে উঠলো নতুন বিদ্যাস্হান।

প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল সেখানে।যজ্ঞশালা ও গোশালা ছিল সেখানে। কৃষি জমি সহ সব কিছু।কাত্যায়নীর হাতে ছিল সব দায়িত্ব। আশ্রমকেই আহারের ব্যবস্থা করতে হতো।এই আশ্রম বসে যাজ্ঞ্যবল্ক্য,নতুন বিচার, সামাজিক   সমন্বয়ে সর্ব শ্রেষ্ঠ তত্ব জ্ঞান 'অহম ব্রহ্মাষ্মি' প্রদান করেন।এখানে বসেই তিনি শতপথ ব্রাহ্মণ রচনা করেন।ভারতীয় ভাষা ও পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় এ অনূদিত হয়েছে।

 তার সৃষ্টি রহস্যের ব্যাখা  বিজ্ঞানের সাথে মিলে যায়।

বিজ্ঞান বলছে সুষপ্তি থেকে ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি। সুযপ্তি মানে এক নিঝুম শুন্যতা। ইংরেজীতে Begining of the Begining বলা হয়। সেখানে অসীম শূন্যতা ছিল অন্যকিছু ছিল না।   Bing Bang হলো।সৃষ্টি হলো।consciousness এর আবির্ভাব হলো।Time and space যুক্ত হলো।যিনি সৃষ্টি করলেন তিনিই ছিলেন না সৃষ্টির সাথে।কে যুক্ত করলো Time and space?এই চিন্তা পদার্থ বিজ্ঞানের ও চিন্তা।

দেখি যাজ্ঞ্যবল্ক্য কি বলেছেন?

ন সদ্য  আসীৎ,ন-সদ-আসীৎ তদানীং ন আসীদ রজ: ন বোম্ পর যৎ।

সৃষ্টির পূর্বে যাহা নাই তা ছিল না,যাহা আছে তাও ছিল না, ব্রহ্মান্ড ও অন্তরিক্ষ কিছুই ছিল না।

আসীৎ প্রকেতঃ আসীৎ অবাতম স্বধয়া।তীব্র একমত তামাৎ হ।অন্যৎ নঃ  পর কিন্চন আস।।

মৃত্যু ছিল না ।অমৃত ছিল না।রাত্রির  দিন  বা অন্য কিছুই  ছিল না, একমাত্র  চৈতন্য  স্বয়ং নিজেকেই  নিজের মধ্যেই  ধারন করে অবস্থান করছিলেন  বায়ু ক্রিয়ার দ্বারা।

তুচ্ছেন আভূ অপিহিতম যৎ আসীৎ,তপসঃ তৎ মহিমা অজয়তে একম্।

সেই এক অদ্বিতীয় বস্তু,তুচ্ছ আবরণের মাধ্যমে যাহা ঢাকা ছিল,জ্বলনক্রিয়ার(তপসঃ) মহিমার দ্বারা জাত হইলেন।সব কিছু সৃষ্টি করিলেন। 

এ সব এক সঙ্গে জুড়ে দিলে এই দাড়ায় যে সৃষ্টির পূর্বে কিছুই ছিল  না ছিল শুধু চৈতন্যময় সত্বা।যা চিত শক্তি বা আদি শক্তি আখ্যা দেওয়া যেতে পারে।তিনি এক তুচ্ছ আচরণে ঢাকা ছিলেন।জ্বলন প্রক্রিয়ার  সাহায্যে বেরিয়ে এলেন।

Gurukul Indian ancient school
Man making factory 

যাজ্ঞ্যবল্ক্য এক ঋষি ও মহামানব।জীবনকে করেছেন সংঘাত ময়।

Today's weather is not hot and dry.Wind blowing. Temperature is normal .

 South 24 Parganas ,Rajpur- Sonarpur ,Arbinda Nagar,Kolkatta -700150
















 




 


মন্তব্যসমূহ