সিদ্ধার্থ থেকে গৌতম বৌদ্ধ ও ভারতীয় নারী যশোধারা

         ➖✒➖✒


          আনন্দ সংবাদ দিয়েছে   ভারত। সংবাদের শিরোনাম হয়েছে ভারত । ভারত  কর্মভূমি , পুণ্যভূমি এবং দেবভূমি। কতো না মনীষী জন্মেছেন  এখানে!তাদের ভাব ও আদর্শ নিয়ে ভারতবর্ষ।  ভারতের  ইতিহাস  পুণ্য ইতিহাস   । ভারতের ইতি কথা   শোনা ও পুণ্যকাজ।  ভারতবর্ষ জ্ঞানের দেশ, অভাব নেই  কাব্য সাহিত্যের, নেই   আআধ্মাতিকতা  ও    দর্শনের   অভাব। বীরেরা জন্মেছেন  এ দেশে, দেশের জন্য  তারা প্রাণ দিয়েছেন। নগ্ন পায়ে  নগ্ন  দেহে সব কিছু ছুড়ে ফেলে দিয়ে তারা বলেছেন ,"আমি তাকে জেনেছি"। আনন্দ সন্তান  আমরা তাই আনন্দে থাকবো।

মহিমান্বিত  জীবনের  বৌদ্ধ  ও যশোধারা।

গৌতম বুদ্ধ ও যশোধারা



          কখনও  রাজার ছেলে রাজ্য  পাট ছুড়ে ফেলে দিয়ে সেই মহান ও অসীমকে জানার জন্য  জীবন কে ব্যায় করেছেন । সীমার মাঝে অসীম তুমি বলেছেন  আমাদের  ঝষিরা। আবার  কেউ বলেছেন  যা কিছু দেখছো সব তোমার নয়।আমার আমার  করোনা। তারা বলেছেন ত্যাগ করে ভোগ করো।

          আজকের নেপাল তখন ভারতের  অঙ্গ  রাজ্য। ভারতবর্ষে তখন ধনদৌলতের অভাব ছিল না ।  পৃথিবীর  ধনী দেশ ভারতবর্ষ । বার বার দৌলতে র লোভে আসুরিক  শক্তি আক্রমণ  করেছে এই দেশ। নেপালের সেই রাজ্যটির রাজধানী কপিলা বস্তু। রাজ্যটির নাম কৌশল । শুদ্ধোধন এখানকার  রাজা। তারই  এক মাত্র  ছেলে সিদ্ধার্থ।  বসে থাকে বাগানে উদাস মুখে। কি যেন খুজে আনমনে। বাবার মনে চিন্তার  বলি রেখা! তিনি মনে মনে ভাবেন এই ছেলে কি করে রাজ্য  চালাবে?

       রাজপরিবারের এক আত্মীয় নাম তার দেবদত্ত খেলা করে তার সাথে। বয়সে বড়ো। একদিন উড়ে যাওয়া পাখি শিকার     করলো সে। তীর বিদ্ধ পাখিটি     ধরে ফেললো সিদ্ধার্থ।     দেবদত্ত ফেরত চাইলো পাখিটি এবং বললো শিকার যে করে পাখি তার । তাই এই তীর বিদ্ধ পাখিটি আমার। 

          সিদ্ধার্থ  বললো ,"পাখিটি আমার , কারন পাখিটি আমার  কাছে আশ্রয় পেয়েছে। তাই এটি আমার"।  দেবদত্ত  রাজার কাছে অভিযোগ  জানালো। রাজপুত্রের এই মানসিকতাতো ক্ষত্রিয় গুন সম্পন্ন নয়। তিনি চিন্তিত  হলেন। সিদ্ধার্থকে ডাকলেন এবং বললেন।

         সিদ্ধার্থ কে বললেন ," তুমি দেবদত্তের শিকার  করা পাখি অধিকারে নিয়েছো  কেন "?

       এই পাখিটি আমার  কাছে আশ্রয় চেয়েছে। শরণাপন্ন কে আশ্রয় দেওয়া আমার  কর্তব্য।  তাই পাখিটি আমার। রাজা প্রমাদ গুনলেন।

        মনে পড়ে গেল জ্যোতিষিদের কথা। জন্মের পর রাজজ্যোতিষি বলেছেন এ সন্তান  ঘরে থাকবে না , সন্নাসী হয়ে যাবে। ষোল বছর  হতেই  তার বিয়ের আয়োজন  করলেন রাজা । 

          বিভিন্ন রাজ্যের রাজকন্যারা এসেছেন বিয়ের প্রস্তাব  নিয়ে।     তারা কোশল  রাজ্যের অতিথি।   রাজপ্রসাদে আগত কনেদের সঙ্গে কথা বলছেন সিদ্ধার্থ। মেয়েদের  সম্মান  ছিল  এক উচ্চতায়। ভারতে ইসলামিক  আক্রমণের পর মেয়েদের  উপর অত্যাচার  নেমে  আসে।মেয়েদের রক্ষা করতে গৃহবন্দি করা হয়  তাদের। তারা নিজেরাই  বর খুজে নিতেন সেই সময়। সেই উদ্দেশ্যেই রাজার অতিথি হয়েছেন  রাজকন্যারা ।

          পাশেই ছিল এক গণতান্ত্রিক রাজ্য । তার রাজা শুদ্ধোআপ্পু।তার কন্যা হয়ে উঠেছিল বিদূষী । মাকে হারানোর  ব্যাথা তার ছিল। কিন্ত  বিদূষীনি হিসেবে ছড়িয়ে পড়লো তার নাম। তিনি প্রশ্ন  করেন, "প্রাসাদের রাজ কর্মচারীদের কেন তার মতো খাবার পায় না? কেন  তারা রাজার  মতো কাপড় চোপড় পরে না"। কানে গেছে সিদ্ধার্থের সারস কাহিনী ও  সিদ্ধার্থের রাশি ফলের কথাও শুনেছেন। মেয়েটির নাম যশোধারা। রাশি ফল বলছে রাজকন্যা হবে বিদূষী ।

     সিদ্ধার্থের বিয়ের দিন ঘোষনা হতেই যশোধারা উপস্থিত  হলেন কপিলাবস্তুর রাজপ্রসাদে। তিনি রাজ অতিথি হয়ে আসেননি।এসেছিলেন সাধারণ পাণিপ্রার্থী হিসেবেই। তাই রাজপ্রসাদে  প্রবেশ  করতে অনুমতি নিলেন।

         সিদ্ধার্থ  তখন অন্যান্য পাণি প্রার্থীদের  সঙ্গে আলাপ  চারিতায় ব্যস্ত।  যশোধারাকে দেখে মুগ্ধ  হলেন। রূপে লাবন্যে ও জ্ঞানে সবার উপরে যশোধারা। সিদ্ধার্থ বিয়ে করলেন যশোধারাকে।

         যশোধারা ফিরে যেতেই বাবার  কাছে প্রশ্নের  সম্মুখীন  হলে।বললেন, "তোমার সাহস তো কম নয় ,তুমি জ্যোতিষিদের  ভবিষ্যত  বাণী জেনেও বিয়ে করলে সিদ্ধার্থকে " ?

         যশোধারা বললো," আমি তার কাজে সহযোগিতা করতে পৃথিবীতে এসেছি।কাজ সম্পন্ন  হলে বিদায় নেব"।

         বিয়ের তের বছর কেটে গেছে।মায়ার সংসারে যশোধারার কোল আলো করে পুত্র  এলো। নামকরণ  হলো রাহুল। 

         রাজার ছেলে সিদ্ধার্থ  অভাব  দেখেননি কোনদিন।দেখেননি রোগ, শোক ও সন্তাপ।সুঠাম  শরীরের অধিকারী সিদ্ধার্থ। ক্ষত্রিয় রক্ত ধমণীতে বইছে। যুদ্ধ  বিগ্রহ  করেছেন। একদিন  ঘোড়ায় চড়ে  শহর দেখতে বেরুলেন। ঘোড়ার  রশি ধরছেন  সেবক।

       এক রোগী দেখতে পেলেন  হাটতে কষ্ট হচ্ছে।সেবক তাকে ধরে রাস্তা পার করে দিল। সিদ্ধার্থ  জিজ্ঞেস করলো ,"এ কে" ? এ হাটতে পারছে না কেন?

রাজপুত্র  কোনদিন  রোগী দেখেননি। দেখেছেন  সুখ ও ঐশ্বর্য। 

সেবক  বললো  "হে রাজন! রোগে ও শোকে মানুষ  পিড়ীত  হয়ে যায়।তার সেবা করাই আমাদের ধর্ম। যে কোন  মানুষের এই অবস্থা হতে পারে "।

রাজপুত্র  বললো,"আমার ও হতে পারে"।

সেবক বললো," এ ভগবানের ইচ্ছা"।

        অন্য দিন রাজপুত্র বেরিয়েছেন শহর দেখতে। পথে পড়লো এক বৃদ্ধ। শরীরে শক্তি নেই। শরীর  অসুস্থ ।

   বৃদ্ধ  রাস্তা পারাপার   হতে চাইছে ।কিন্ত  সামর্থ নেই।      রাজপুত্র  বললেন, "এ কে"? 

সেবক বললো ,"এ বৃদ্ধ ।সময়ে আমারাও হবো"।

রাজপুত্র বললো,"আমি বৃদ্ধ  হবো। আমার  এই সুগঠিত শরীর আমার,  তাও এই রকম হবে"।

সেবক বললো ,"হ্যা।  রাজন।আমরা সবাই  একদিন  এই রকমই হবো"।

"ফিরে চলো! রাজপ্রসাদে"।সিদ্ধার্থ  বললেন । চিন্তার  পাহাড় জমেছে।সমস্ত কিছু পাল্টে যাচ্ছে।ঝড় বইছে মনোজগতে।

        পরদিন রাজপুত্র চললন জঙ্গলের  দিকে। রবীন্দ্রনাথ  বলেছেন  ভারতীয় সভ্যতা বনে। জঙ্গলে যেতেই  দেখতে পেলেন  এক অর্ধ  নগ্ন মানুষ কে ঘিরে আছে কিছু যুবক।তাদের উপস্থিতি টের পেল না ঐ যুবকেরা। তারা অর্ধ  নগ্ন মানুষটির কথা শুনছিল।

 রাজপুত্র জিজ্ঞেস করলো," ঐ যুবক ও ঐ অর্ধ  নগ্ন  মানুষ টি কে"?

সেবক বললো ,"ঐ ব্যক্তি সর্ব ত্যাগ কারি সন্নাসী।তিনি ঈশ্বরকে জানেন। তার মনে শুধু মানব কল্যাণ।  তাই সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে তার কথা "।

রাজপুত্র আবার  বললো,"তার কাছে যুবক রা কি করছে"?

"তিনি বিদ্যাদান করছেন"  সেবক বললো।

রাজপুত্র  বললো,"ফিরে চলো! সেবক"

         চিন্তার জগতে ডুবে গেলেন রাজপুত্র। উঠে দেখতে গেলেন  পুত্র  ও স্ত্রীকে।মায়ার রূপ দেখতে পেলেন।যশোধারার  মুখে চাঁদের আলো। মায়ার বাঁধনে বাঁধতে চাইছে বালক রাহুল। আর নয়।রাত্রি গভীর। সেবক কে ডাকলেন রাজপুত্র। বললেন  "চলো! সেবক "।

সেবক  বললো,"এই রাত্রিতে বের হওয়া নিরাপদ নয়"।

রাজপুত্র বললেন, "আমার আদেশ "।

       জঙ্গলমহলে চলে এলো রাজপুত্র। সেবকের হাতে ঘোড়ার রশি দিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে গেলেন রাজপুত্র। কাঁদতে কাঁদতে  রাজপ্রসাদে ফিরলে সেবক। 

        যশোধারা পুত্র কে নিয়ে ডুবে গেলেন  সাধনায়।সংসারের  কোন বাধনই তাকে বাধতে পারলো না। 

       একদিন  শশুর ও বাবা এসে বললেন ,"তুমি, রাজ্যপাট  সামলাও  । তুমি শাসন করো"।

      যশোধারা বললো ,"রাজ্যের চেয়ে ঈশ্বর  সাধনা বড়ো। আমি রাজ্য শাসনে লালায়িত নই"। বাবা ও শশুর ফিরে গেলেন। 

      দিন যায়। ফিরে এলেন  সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধদেব  হয়ে। জনপদের তার আলোচনা। প্রথম দিকে যাননি যশোধারা।  একদিন  বুদ্ধ সঙ্ঘে যোগ দিলেন। ছেলে রাহুল  তাই করলো। প্রতিদিন  বুদ্ধদেবের প্রবচন শোনেন। বাইরের বাড়ীতে থাকেন।দেবদত্ত  যোগ দিয়েছেন  বুদ্ধ সঙ্ঘে।

       একদিন  যশোধারা এলেন। প্রবচন কক্ষে।বললেন, "আমার  যাওয়ার  সময় হয়েছে।আমি ফিরে যাচ্ছি নিজ ধামে "।

          বুদ্ধ  চোখ খুললেন।রহস্যময়  হাসি হাসলেন। আবার চোখ বুঝলেন। নিজের ঘরে ফিরে এলেন  যশোধারা  । সমাপ্ত  হলো এক মহান  নারীর জীবন। লোভ লালসা হীন ত্যাগের  অক্ষরে লেখা থাকবে থাকবে তার জীবন। এই হলো ভারত বর্ষ। 



 

মন্তব্যসমূহ