মহাপুরুষের ধারনা ও আদর্শ

           বাংলার ইতিহাস  বড়ই  গৌরবের। এখানে এমন অনেক  মানুষ  জন্মেছেন    যারা শুধু ভারতকেই নাড়া দেন নি সাড়া পৃথিবীকে  প্রভাবিত করেছেন।   

          বাংলার বাঘ আশুতোষ  মুখার্জি,ক্ষুদিরাম  বসু, আচার্য  প্রফুল্ল  চন্দ্রে ও জানকি   বসুর  কাহিনী। বাংলার  সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা আন্দোলনে এদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলায় তখন নব জাগরনের যুগ। রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দকে  ঘিরে যে স্বর্নযুগের আবির্ভাব  হয়েছিল  সেই স্বর্ন যুগে তারা তাদের ভূমিকা রেখেছিলেন। 

        আশুতোষ মুখার্জি বাংলা ও বাঙালির  গৌরব । আশুতোষ  মুখার্জি কে নিয়ে প্রথম কাহিনীটি।

        আশুতোষ  মুখার্জি  তখন কলিকাতা হাইকোর্টের  বিচার  পতি। একবারে ঐ পদে থেকে ও তিনি সবসময়ই বাঙালির বেশভূষা ধুতি জামা পরেই থাকতেন।তিনি বিদেশীদের  পোষাকের  ঘোর বিরোধী ছিলেন। হাইকোর্টে যাওয়ার  সময় ছাড়া অন্য  সময় কোন বিদেশী পোষাক পারতেন না।

      স্যাডলার কমিশনের  সদস্য  হিসেবে তিনি একবার  মহীশূর রাজ্যে গিয়েছিলেন।  কমিশনের  সদস্যদের  সম্মানার্থে  রাজ দরবারে  এক ভোজনের আয়োজন  করা হয়েছিল।  বিদেশী পোষাকে  সজ্জিত  হয়ে মাথায় টুপি  পরেই  সব অতিথিরা ঐখানে  গিয়েছিলেন।  কিন্ত  আশুতোষ  যখন নিজের  পরিচয় দিলেন তখন রাজ মন্ত্রী কে খবর দেওয়া হলো। তিনি এসে বিনীত ভাবে বললেন, "স্যার ,খালি মাথায় কারোর দরবারে প্রবেশ করার অধিকার  নেই। আপনাকে একটা পাগড়ি দিচ্ছি তা পরে দরবারে হাজির  হউন।"

            আশুতোষ বললেন "বাঙালিরা পাগড়ি পরে না। আমি কেন পরবো? আমি কোনদিন  পাগড়ি পরিনি, আমি পরবো না । মহারাজকে নমস্কার  জানাবেন।  আমি ফিরে চললাম। "

          মহীশূর  রাজার কাছে খবর পৌছলো।তিনি মন্ত্রীকে তিরস্কার করলেন।স্বয়ং যুবরাজ কে পাঠালেন  আশুতোষ কে নিয়ে আসার  জন্য। এক বাঙালি বাঙালি পোষাকে ও পাগড়ি ছাড়াই এলেন।  রাজা তার  কাছে ক্ষমা চাইলেন।

          1922 সালের  কাছাকাছি  সময়। আচার্য  প্রফুল্ল চন্দ্র তখন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপকের  দায়িত্ব  থেকে অবসর নিয়েছেন।  পেনশন প্রায় 400 টাকা।কিন্ত  নিজের খরচ  40 টাকার  বেশি নয়।বাকি টাকা ব্যাঙ্কে জমা। গরীব ছাত্রদের মাসিক সাহায্য, দু:স্হ লোকেদের  দান, আবার  কখনও  স্বদেশী কাজে আর্থিক  সহযোগিতা কতো রকম  ভাবে যে  করেন তার ইয়ত্তা নেই। 

          সেদিন  নিজের  জন্ম ভিটে রাড়ুলি থেকে গরীব ছাত্র  এসেছে দেখা করতে।গায়ে সস্তা দামের টেরিকটের বিদেশী জামা কাপড় প্যান্ট।  গ্রামের কথা,পড়াশোনার খবর নেওয়ার পর প্রফুল্ল চন্দ্র  জিজ্ঞেস করলেন,-"তোমরা বিলিতি   জামা প্যান্ট  কেন  পরেছো ? এদেশের  সূতির জামা কি খারাপ?  ছেলে দুটি ইতস্তত  করে বললো,"এগুলো সস্তা।আমাদের দেশী জিনিস কেনার  সামর্থ্য  কই ?"

             প্রফুল্ল চন্দ্র বললেন  ,"তোমারা যদি পোষাকে আশাকে ইংরেজ  হয়ে যাও তবে কি ইংরেজ  তাড়ানো যাবে ? সস্তা বলে বিদেশী জিনিস  পড়তে হবে তা ঠিক  নয়। কষ্ট  করেও দেশের জিনিস  পড়া উচিত। "

           ছেলে দুটি চলে যেতে প্রফুল্ল চন্দ্র  খবর পাঠালেন  তার স্নেহধন্য সতীশ চন্দ্র  দাশগুপ্ত  মহাশয় কে।  এবং বললেন "সতীশ  তোমাকে একটা বড় কাজ করতে হবে। সস্তা দামের  দেশী কাপড় তৈরী করতে হবে। তা না হলে আমাদের দেশের লোক সস্তা কাপড় পরে কালো চামড়ার বিদেশী হয়ে উঠবে। আমি চাই সস্তার দেশী  পোষাক পরে  আমার  দেশের  মানুষ  স্বদেশী হয়ে বাচুক। শুধু উপদেশ  দেওয়াই নয় বন্যা ত্রাণে তোলা সব উদ্বৃত্ত  টাকাই সতীশের হাতে তোলে দিলেন  খাতির কারখানা তৈরিতে।

            ভারতে তখন  ইংরেজ  শাসন। চারিদিকে স্বদেশী জাগরণের  জোয়ার। ক্ষুদিরামের তখন  কতোই বয়স।চৌদ্দ পনের বয়স হবে । থাকে মেদিনীপুরে দিদির  বাড়িতে । সাগরেদ ভাগ্না ললিতমোহন।

        এই বয়সেই ক্ষুদে ভর্ত্তি হয়েছে স্বদেশীদের দলে। সেই কাজে বাড়ি ফিরতে মাঝে মাঝে বেশ রাত  হয়। দিদি জামাই বাবুতে তখন গভীর  ঘুম।ললিতমোহন চুপি চুপি দরজা খুলে দেয়। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে ঢাকা দেওয়া খাবার  খেয়ে ঘুমিয়ে পড়া।এরকম মাঝে মাঝেই  হয়।

         সেদিন  রান্নাঘরে গিয়ে দেখে বেড়ালে সব খাবার  খেয়ে গেছে।এদিকে খিদে পেট চুই চুই ।কোথাও  শুকনো খাবারও  নেই।  ক্ষুদে ভাগ্নে বললো- ভালোই হলো বুঝলাম,মাঝে মাঝে রাত্রে উপোষ দেওয়া ভালো। তাতে শরীর ভালো থাকে।" দুজনে এসে শুয়ে পড়লো কিন্ত  চোখে ঘুম নেই। রাত যতো বাড়ে খিদে বাড়ে। শেষ আর থাকতে না পেরে দুজনে বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়, যদি কিছু পাওয়া যায় এই আশায়।কিন্ত  রাত তিনটে সময় কোথাও  কি কিছু পাওয়া যায়? 

      একটু দূরেই কুসুম কুমারের বাড়ী গরীব বিধবা যুবতী। দিন চলে কলাইর বড়ি করে। সে দিন সে রাত জেগে ডাল বাটছিল।দূর থেকে কুসমের ঘরের আলো দেখে মামা ভাগ্নে উপস্থিত  হলো সেখানে। কুসম তাদের  রাতে দেখে এদের কে দেখে নিয়ে গেল বাড়িতে। সব শুনে বললো," ঘরে যা আছে তাই  দুটো খেয়ে নাও।" ললিত তো এক পায়ে খাড়া। কিন্ত  ক্ষুদে ভাগ্নেকে ইশারায় দেখালো কুসম চুপি পরে আছে।ক্ষুদিরামের  এই ইঙ্গিত  বুঝতে পারলো কুসম।সঙ্গে সঙ্গেই  বুঝতে পারলো কুসম। ভেঙ্গে ফেললো চুড়ি।

      পরে কুসম গ্রামে গ্রামে দেশী শাড়ি বিক্রি করতো।অতিরিক্ত  শাড়ি বিক্রিরপয়সা দিয়ে দিতো স্বদেশী কাজে। মানুষ কে বুঝাতো দেশের কথা।সাধারণ  মানুষের  অসাধারন দেশ প্রেম।

   নেতাজীর  কথা কে না জানে এক অসাধারণ ত্যাগের  জন্য সুভাষচন্দ্র  বসু নেতাজী হয়েছেন।  নেতাজীর পিতার  নাম  জানকিনাথ বসু।  কটক হাইকোর্টের  নাম করা ব্যারিস্টার। বাড়িতে সাহেবীয়ানা পুরোমাত্রায়। বাড়ীতে সাহেবীয়ানা পুরোমাত্রায়। ছেলেরা ও সব সাহেবী কায়দায় মানুষ। এক মাত্র  ব্যতিক্রম  সুভাষ। চলনে বলনে

 পোষাকে    সব ছেলেরা পুরোদস্তুর  সাহেব।  শুধু সুভাষ  ছাড়া।

       ছেলেবেলার খ্রীষ্টান  মিশনের স্কুলের  পরিবেশ তার পছন্দ  হয়নি বলে বাবা অগত্যা বাঙালি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলেন।  প্রথম দিনে স্কুলে
অমিত  তেজা দেশপ্রেমিক  নেতাজী

আত্মত্যাগ চরম কাষ্ঠা


র  প্রধান শিক্ষক বেণীমাধব  দাসের দেখে তার ভালো লাগলো ।বেণী বাবুর পরণে

 সাদা  ধুতি পাঞ্জাবী,নরম সুরে কতো  মিষ্টি করেই না কথা বলেন। সুভাষ ভাবলো বিদ্যালয়ের  প্রধান  শিক্ষক  যদি ধুতি পরে আসতে পারেন  তবে আমি পরে আসতে পারবো না কেন ?

সেদিন বাড়ী ফিরে রাত্রে শোবার  সময় চোখে পড়লো স্বামী বিবেকানন্দের সন্নাসী পরিহিত ছবিটার  দিকে। ভাবতে লাগলো স্বামী বিবেকানন্দ  যদি গৈরিক  পোষাক  পরিধান  করে বিশ্বে সমাদৃত হতে পারেন  তবে আমি কেন কোট প্যান্ট  পরবো ?পরের দিন  বাবা তো তার ধুতি পরা দেখে রেগে অস্হির। এ কি পোষাক  তুমি পরেছো ? ধুতি জামা একই স্কুলে যাওয়ার বেশ ? সুভাষ! একই স্কুলের  যাওয়ার  পোষাক ? সুভাষ  বললো এই  তো আমার  দেশের পোষাক। এই পোষাকে কি আমায় খারাপ  দেখাচ্ছে ? ছেলের উত্তর  শুনে জানকিনাথ  বসু স্তম্ভিত  হয়ে গেলেন। 

 


মন্তব্যসমূহ