রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস দক্ষিন চব্বিশ পরগনার সুন্দর বনে। সোনারপুরের অরবিন্দ নগর থেকে লিখছি।পিন কোড 700150
✒ সাগর দ্বীপ বা গঙ্গাসাগর এক ঐতিহাসিক তীর্থ স্হান। এই তীর্থ স্হান যুগ যুগ ধরে ভারতকে অনুপ্রাণিত করেছে। ভারতবর্ষ তার যুগ সূত্র স্হাপন করেছে এই জেলার সাথে আধ্মাতিকতার সূত্রে। এক ঐক্য বদ্ধ ভারতের রূপ পাওয়া যায় এই মেলায়।
দক্ষিন চব্বিশ পরগনা বাংলার একটি জেলা।সমুদ্র সংলগ্ন এই জেলাতেই বিশ্ব স্মারক সুন্দর বন অন্চল অবস্থিত।
প্রাচীন ইতিহাসে এই জেলা পাতাল অন্চল নামে পরিচিত। বাল্মিকি বলেছেন কপিল মুনির আশ্রম রসাতলে অবস্থিত ।তিনি সাগরের কথা বলেছেন। এ অঞ্চলের অধিবাসীদের ম্লেচ্ছ বলা হতো। ম্লেচ্ছ মানে অপরিষ্কার ও অনাচারি।
পূর্বে এই সুন্দর বনের নাম ছিল কালকবন। পানিনি ও পাতঞ্জলি ভারতের পূর্বের সীমানা নির্ধারণ করতে গিয়ে কালকবনের উল্লেখ করেছেন। অনেকে মনে করেন এটাই সুন্দর বন।
 |
সুন্দরবনের গৌরব ও পরিচয় রয়েল বেঙ্গল টাইগার। |
এখানে গড়ে উঠেছিল গঙ্গা রিডি সভ্যতা। সুন্দর বনের এই নাম সারা পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে আছে। রোমান সাম্রাজ্যের গৃহযুদ্ধে এরা আগষ্টসাসের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। রোমের কবি ভার্জিল বলেছেন " গঙ্গারিডি সভ্যতার বীরত্ব কাহিনী স্বর্নাক্ষরে লেখা থাকবে।" আলেকজান্ডারের বাহিনী এদের ভয়ে আর অগ্রসর হয়নি।
বাংলা তখন বারোভূঈয়াদের শাসন। তারা ছোট ছোট রাজা ছিলেন। তারা সবাই মোগল পাঠান দের সাথে লড়াই করেছেন ও প্রাণ দিয়েছেন। কিন্ত স্বাধীনতার বিনিময়ে সন্দ্ধি করেননি।
এক দিকে মুসলিম বাহিনীর অত্যাচার ।অন্যদিকে পর্তুগীজ দের অত্যাচার ।পর্তুগীজ দস্যুরা সমুদ্র পথ ধরে আসতো। মধ্যযুগে এই অন্চল জন বিরল হয়ে যায়।
পর্তুগীজরা প্রায় 42000 লোককে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে।নারীরা ও অত্যাচারিত হয়। এরা ছিল অসুর প্রকৃতির মানুষ। কোন শিক্ষা দীক্ষা ছিল না। এরা মানুষ ধরে হাতে ছিদ্র করে বেড়ি পরাতো।পর্তুগীজ দের অত্যাচারে এ জেলা প্রায় জনশুন্য হয়ে যায়।
রাজা প্রতাপাদিত্যের শাসনে এরা অত্যাচার বন্ধ করে। অনেকে কেদার রায়ের ও প্রতাপাদিত্যের সেনাতে যোগ দেয়। রাজা প্রতাপাদিত্যের অনেক সেনাগড় এই জেলায় ছিল। তিনি 1557 সালে সিংহাসনে আরোহন করেন। 1610 সালে তিনি আরব মোগল ইসলামিক সাম্রাজ্য বাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেন বন্দি হন। তাকে খাচায় ভরে দিল্লী নিয়ে যাওয়ার পথে মারা যান।তিনিই শেষ হিন্দু রাজা।
1757 সালে মুর্শিদ কুলি খাঁ চব্বিশ টি স্হানের ইজারা দেন। পরে এই চব্বিশ পরগনা নামে অভিহিত হয়। ভাঙ্গর,সোনারপুর,বারুইপুর,ক্যানিং,জয়নগর,গোসবা,ডায়মন্ড হারবার,বাসন্তী ,বোড়াল,বাঘের খোল ,গড়িয়ার কিয়দংশ ও সুন্দর বন অন্চল নিয়ে বর্তমান দক্ষিন চব্বিশ পরগনা অন্চল।
সাবর্ণ চৌধুরীর পরিবারের পূর্ব পুরুষ মদন মোহনের তিন লাখ টাকা নবাবের সদরে বাকী পরে যায় তিনি গ্রেফতার হন। গাজীর পীরের সুপারিশে তিনি মুক্ত হন।ঘুটিয়া শরীফের পীর কে এই অন্চল টি দান করেন।তা আজ হিন্দু বিরোধীদের পীঠ স্হান।
বারুইপুর একটি মহকুমা।ফল চাষের জন্য বিখ্যাত। এখানে নিম্ন আদালত রয়েছ । আটি সারা গ্রামে চৈতন্য দেব এসেছিলেন। তার চরণের ছাপ একটি মন্দিরে রক্ষিত আছে।বারুইপুরের পাশ দিয়ে আদি গঙ্গা প্রবাহিত হতো। বারুইপুর ও তারদাহ বড় বন্দর ছিল। রোমান জাহাজ এখানে আসতো। বারুইপুরে বঙ্কিম চন্দ্র ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করেন। নব গোপাল মিত্র হিন্দু মেলা নামে একটি সংগঠন করেন। রবীন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্র ঠাকুর এই মেলার সদস্য ছিলেন। গিরিশ ঘোষও সদস্য ছিলেন। নব গোপাল মিত্র বারুইপুর এসেছিলেন। এবং হিন্দু মেলার আয়োজন করেন হ্রাস মাঠে ।
সোনারপুর রাজপুর একটি পৌরসভা ।এ সম্পর্কিত তথ্য নীচের লিঙ্কে রয়েছে।
#https://wwwbengalsanatan.blogspot.com/2023/08/blog-post.html
#https://wwwbengalsanatan.blogspot.com/2023/08/blog-post_16.html
দক্ষিন চব্বিশ পরগনার সৌন্দর্য ও গৌরব হলো সুন্দর বন। সুন্দর বন হলো সর্বদক্ষিণে অবস্থিত বনভূমি। এ অন্চল সংরক্ষিত অন্চল। পূর্বে সুন্দরবনের কি রূপ ছিল তা কল্পনা করা দু:সাধ্য। এই বিপদ সঙ্কুল বন কেন সুন্দরবন হলো তা বলা মুশকিল। চন্দ্র ভন্ড নামে এক জাতি ছিল। তারা লবণ প্রস্তুত কারি ছিল। তাদের নামের অনুসারে চন্দ্রবন থেকে সুন্দর বন। সমুদ্রের তীরে
অবস্হিত এই বন ভূমি।আন্তর্জাতিক সীমানা সংলগ্ন এই বনভূমি এখন পৃথিবীর হেরিটেজ। খুব সামান্য অংশ ভারতে। সুন্দর বনের এই নামকরন নিয়ে নানা মত।সুন্দরী বৃক্ষের প্রাধান্য হেতু এই বনের নাম সুন্দরবন। ক্যানিং , গোসবা, সন্দেশ খালি প্রভৃতি অন্চল সুন্দরবন সংলগ্ন। এর পরেই মূল বন।মোট 54টি দ্বীপ নিয়ে এই সুন্দরবন। এই সমস্ত দ্বীপের অনেক মৃল ভৃখন্ডের সাথে মিশে গেছে।
এই বনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস। রয়েল বেঙ্গল টাইগার ধূর্ত ও নিঃশব্দে শত্রুকে অনুসরন করে। চার পাঁচ কিলোমিটার নি:শব্দে অনুসরন করে। হলুদ ও ডোরাকাটা রঙের এই বাঘের গায়ের জোর বেশী। বাঘে মানুষে শত্রুতা চিরদিনের। এই বাঘ কাদায় নেমে মাছ খায়। মানুষ ও প্রাণী খায়।বাঘ মানুষ খায় বাধ্য হয়েই। দুর্বল বা আঘাত প্রাপ্ত হলে মানুষ খেতে শুরু করে। এরা সাধারণত হরিণ ও শুকর খায়। সুন্দরবনের বাঘ সাতার কাটতে পারে । নি: শব্দে নৌকা থেকে মানুষ তোলে পালায়। সুন্দর বনের গন্ডার পাওয়া যেতো এখন প্রায় লুপ্ত।চিতা হরিণ ও কুকুর হরিণ রয়ে গেছে। হিংস্র কুমির কমে এসেছিল। মানুষের কারণে গন্ডার ও কুমির লুপ্ত হচ্ছিল। বর্তমানে কুমির ও ব্যাঘ্র প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে সজারু,কাঠবিড়ালী, ভাম,বেজী, বন বিড়াল,উদ,মাছ ভোদড়, গন্ধ গোকুল।
গাছ গাছালির বৈচিত্র্যে ভরা সুন্দরবন।সুন্দরী গাছ প্রায় সত্তর ফুট উচু হয়। লাল টকে টকে ফুল ও কাঠ হয়। গরাণ,হেতাল, গোলপাতা, খরিকাঠ,পাশুর,পাইন,গর্জন, কাকড়া কেওড়া , পাইন,জেঙ্গুয়া,গেওয়া প্রভৃতি গাছ রয়েছে।
গোসাপ,ময়লা,শাখামুটি,চন্দ্র বোড়া,চক্রধরগোখরো,কেউটে শঙ্খচুড়, গেছো বোড়া,লাউডগা, কালনাগিনী প্রভৃতি সাপ পাওয়া যায়। ময়াল সাপ ছাগল,হরিণ,বাদর শুকর প্রভৃতি খায়। কালনাগিনি,চন্দ্র বোড়া বিষাক্ত সাপ।
পাখির বাস এখনে। মাছ রাঙা গাঙ্গ চিল, কুররী,গগনবেড়, পাণি কৌড়ি, কাক,বক,ধূসর কাক, পানডুবি, সোনা জঙ্গা, হাড়গিলা, গাছলিখ , গয়ার, শামুক খোল, মানিক জোড়,শ্বেতষ্টর্ক, কৃষ্ণ ষ্টর্ক, কানঠুটি, মরাল রাজ হাস,বন্যমুরগি,জলমোরগ,বেগুনি জলমুরগি,কুটির ,জলপিপি পাখির দেখা মিলে।
নদনদীর শেষ নেই এই জেলাতে। বিদ্যাধরি নদী তার সে রূপ নেই।মাতলা মাতার মতো বয়ে চলেছে।রায়মঙ্গল বয়ে চলেছে গোসবা হয়ে সাগরে।সঙ্গে বোন কালিন্দী কে। সপ্তমুখী কাক দ্বীপ হয়ে সাগরে। রায়মঙ্গল ও মাতলা মিলে তৈরি হয়েছে গোসাবা স্রোত। ভৈরব হারিয়েছে তার বৈভব। ঠাকুরাণ জয়নগরের কাছে উৎপন্ন হয়ে সাগরে পড়েছে জামিরা নাম নিয়ে। বড়তলা, কালিন্দি,কান্না,কার্জন ক্রিকেট প্রভৃতি নদী বয়ে চলেছে।
দক্ষিন চব্বিশ পরগনা নদনদী এবং খাল বিলে পরিপূর্ণ এই জেলায় মৎস্যজীবিরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে।নানা ধরনের মাছ পাওয়া যায়।নোনা জলের মাছের সঙ্গে মিষ্টি জলের মাছ ও পাওয়া যায় কাকদ্বীপ,মথুরাপুর,কৈখালীএবং সাগর প্রভৃতি অন্চলে মাছ ধরা হয়।নিমপীঠ আশ্রম প্রথমেই এই কাজে সাহায্য করে । চন্দ্রের অবস্থানের উপর মাছ ধরা নির্ভর করে। ট্রলার ও মজবুত জাল মাছ ধরার কাজে ব্যবহার হয়। ইলিশ,ট্যাংরা,ভেটকি,ভাঙন,পারশে, খরশুল্যা,নোনা,ট্যাংরা,গাগড়া,পাঙাশ,কারন মাগুর প্রভৃতি পাওয়া যায় । এ ছাড়া বোমলা,তেলতাপরি,শিলা(ভোলা) মেলা,ভোলা,শিশ ভেটকি, চেলা,ফেসা এবং অন্যান্য মাছ পাওয়া যায়।
মধু সুন্দরবন অঞ্চলের সম্পদ । 1980 -82 সালে ভারত সরকারের মধু সংগ্রহ থেকে রাজস্ব আয় হয়েছিল 97545.50 পয়সা। পশ্চিম বঙ্গ সরকার মধু থেকে রাজস্ব আদায় করে । মোম থেকে আদায় করে। সুন্দর বন থেকে ছয় হাজার মন মধু সংগ্রহ করা যায়। চৈত্র মাসে মউলেরা যাত্রা করে করে মধু সংগ্রহ করতে। মধু সংগ্রহ করা কষ্ট সাধ্য ও দু:সাধ্য। মধু পাখি উড়তে দেখে সেই ধরে এগুতে হয় এবং তাই দেখে মধুর চাক বের করতে হয়।সাপ ও বাঘের কামড়ে মউলেরা মারা যায় । মধু সরকারি সম্পদ । জনপদের কেউ এ সংগ্রহ করতে পারে না।
দক্ষিন চব্বিশ পরগনার জমি চাষযোগ্য।ধান চাষ হয়।আবার সব্জির চাষ হয়। ফল চাষের অভাব। ফল চাষের মাধ্যমেই এই অঞ্চলের উন্নতি হবে।
এই জেলাতেই বারোটি ব্লক রয়েছে।সাগর ,নামখানা,কাকদ্বীপ,পাথর প্রতিমা, মথুরাপুর 1,মথুরাপুর 2,জয়নগর 1,জয়নগর 2,কুলতলি,ক্যানিং 1 এবং 2,বাসন্তী,গোসাবা
এই সব স্হান নিয়ে দক্ষিন চব্বিশ পরগনা জেলা। সুন্দর বনের কিয়দংশ এই জেলার অন্তর্গত।
মহকুমা অনুযায়ী পাচটি ভাগে বিভক্ত। ক্যানিং,আলিপুর সদর,বারুইপুর ও ডায়মন্ড হারবার ও কাকদ্বীপ মহকুমা। 312 টি পঞ্চায়েত রয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে।মাতলা নদীর উপর সেতু নির্মাণ হওয়া যাতায়াত সহজ হয়েছে।অনেক দ্বীপে জল পথে যাওয়ার উপায় আছে।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আমর বাংলা ব্লগে সবাই কে অভিনন্দন। মন্তব্য করতে পারেন।